বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

দাঙ্গা বিদ্ধস্ত দিল্লী




দাঙ্গা বিদ্ধস্ত দিল্লী

ঘটনার তিনদিনের মাথায় মৃত ২৩ জন। আহত ১৮০ হন। সরকারি তথ্যমাত্র। প্রকৃত অবস্থা এখনো পরিস্কার নয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কল্পনার অতীত। না, ঘটনা হঠাৎ করে ঘটে নি। খুব ভালো করে পরিকল্পনা করেই ঘটানো হয়েছে। ঘটানো হয়েছে কেন, সেটি ঘটনা পরম্পরা ভালো করে পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে। বাস্তবে অনভিপ্রেত, বিশেষ করে হিংসাত্মক ঘটনাগুলির পর, যে পক্ষ অধিকত সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছিয়ে যায়, যে পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়, বুঝতে হবে ঘটনার পিছনে মূল পরিকল্পনায় তাদেরই মদত থাকা স্বাভাবিক। এমনটাই সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গিয়েছে দেশে বিদেশে। সে গুজরাট দাঙ্গাই হোক। গোধরা কাণ্ডই হোক। টুইন টাওয়ার ধ্বংসই হোক। পুলওয়ামার মৃত্যু মিছিলই হোক্, দেখতে হবে প্রতিটি ঘটনার ফলে কোন পক্ষের স্বার্থ অধিকতর সুরক্ষিত হয়েছে। কোন পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি দ্রুততর বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তখন আর এটা বোঝা দুঃসাধ্য হবে না, মূল ঘটনাগুলি কাদের স্বার্থে ঘটানো হয়েছিল। প্রতিটি ঘটনা পরিকল্পিত ভাবে ঘটনোর পিছনে কিছু স্বার্থ জড়িত থাকে। ঘটনার অব্যবহিত পরেই যে সেটি সবসময় পরিস্কার ধরা পড়ে তা নাও হতে পারে। কিন্তু সময়ের সাথে, ঘটনার ফলে কোন পক্ষ অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছিয়ে যায়, সেটি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তখন কোন রহস্যই আর রহস্য থাকে না।

মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

দিল্লী বিধানসভা নির্বাচন ২০২০


দিল্লী বিধানসভা নির্বাচন ২০২০

ইভিএমে আঙ্গুলের চাপ দিয়ে শাহিনবাগে কারেন্ট লাগানোর ডাককে দিল্লীবাসী রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সারা ভারতে একটি স্পষ্ট বার্তা জানিয়ে দিল এই ২০২০’র দিল্লী বিধানসভা নির্বাচনে। দক্ষ প্রশাসন সুশাসন জনসেবামূলক কার্যক্রম শিক্ষা স্বাস্থ বিদ্যুৎ জল ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলিই একটি নির্বাচনের মুখ্য বিষয়। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ধর্মীয় বিভাজন জনগণের স্বাধীন কন্ঠস্বরকে দেশদ্রোহীতা বলে প্রচার ইত্যাদি বিষয়গুলি নির্বাচনে জয়লাভের পক্ষ যথেষ্ট নয়। দিল্লী নির্বাচনের আগে ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে পোশাক দেখে মানুষ চেনার সেই ঐতিহাসিক বয়ানকেও ঝাড়খণ্ডবাসী এইভাবেই রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। জনগণ দলমত ধর্ম বর্ণ শ্রেণী নির্বিশেষে সুস্থ ও নিরাপদ শান্তি ও উন্নয়নমূলক জীবনধারার প্রত্যাশী। সেই জনগণকে কিছুদিনের জন্য জাতপাতের বিভাজন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ধর্মীয় উন্মাদনা প্রতিবেশি দেশের সম্বন্ধে জাতক্রোধ ইত্যাদি বিষয়গুলি দিয়ে বিভ্রান্ত করে রাখা গেলেও, জনগণই সেই বিভ্রান্তি দূর করে সঠিক পথের হদিশ বার করার ক্ষমতা রাখে। সদ্য অনুষ্ঠিত ঝাড়খণ্ড ও দিল্লী বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সেই সত্যকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করল।

মনে রাখতে হবে, সদ্য পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধীতায় দেশব্যাপি তুমুল আন্দোলনের মধ্যেই এই দুটি বিধানসভা নির্বাচন সংঘটিত হয়েছে। ফলে এই দুই নির্বাচনের ফলাফলকে এই আন্দোলনের অভিঘাত থেকে পৃথক করে দেখা যাবে না। নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ যেভাবে পথে নেমে প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছে, তার সরাসরি প্রভাবও সদ্য অনুষ্ঠিত এই দুই নির্বাচনে দেখা গিয়েছে। দুই নির্বাচনেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ এর প্রবক্তা ও সমর্থকদের মুখ পুড়েছে।

বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২০

বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতি



বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতি

সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেশের মানুষের উপর অর্থনৈতিক শোষণ চালানো একটি রাজনৈতিক কার্যক্রম। বর্তমানে ভারতবর্ষের রাজনীতিতে এই কার্যক্রমের সফল প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে অনেকটাই। ক্ষমতার অপব্যবহারেও, এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের প্রয়াস খুবই কার্যকর একটি পদক্ষেপ। শুধুই রাজনৈতিক ভাষণের ভিতর দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো নয়, সরকারী আইন প্রয়োগ করেও এই বিদ্বেষ ছড়ানোর অপপ্রয়াস দেখা যাচ্ছে। আর তারই প্রতিবাদে, সমাজের শুভবোধ সম্পন্ন মানুষ আজকে পথে নামা শুরু করেছে। সংবিধান বিরোধী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনকে হাতিয়ার করে ভারতব্যাপি যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সুখের কথা দেশের ছাত্রসমাজ প্রথমেই তার বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছে। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নারীসমাজের একটি বড়ো অংশ। এর ফলেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ এবং দেশ ব্যাপি এন আর সি ও এন পি আর চালু করার বিরুদ্ধে আসমুদ্র হিমাচল ছাত্র যুবা নারী পথে নেমে প্রতিবাদ শুরু করেছে। সরকার পক্ষ থেকে সেই সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে দ্রুত ফলপ্রসু করে তোলার জন্য যাবতীয় প্রয়াস জারি রয়েছে। আর সেই উদ্দেশেই আন্দোলনরত জনগণের উপর দেশবিরোধী রাষ্ট্রবিরোধী ও বিশ্বাসঘাতক তকমা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জনগণের ভিতর সরকারপন্থীদেরকে নানা ভাবে উস্কানী দেওয়া হচ্ছে সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর উদ্দেশে। এই প্রয়াসে রাজনৈতিক নেতানেত্রী, মন্ত্রী আমলা সকলকেই কাজে লাগানো হচ্ছে খুব নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক।

বুধবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২০

মেন ইন ইউনিফর্ম



মেন ইন ইউনিফর্ম

ক‌োথায় পৌঁছিয়েছে রাজনৈতিক নোংরামো! সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে, নোংরা রাজনৈতিকর সংস্কৃতির আমদানী করা হচ্ছে বিরোধী রাজনীতির পরিসরকে অবরুদ্ধ করে দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে! কয়দিন আগেই দিল্লীতে সরকারী নীতির বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত জন আন্দোলনকে বদনামের ভাগী করার জন্য সরকারী নির্দেশে উর্দি পড়া পুলিশবাহিনীকে বাসে আগুন দিতে দেখা গিয়েছে। প্রায় একই সময়ে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের রাজ্য শাখার এক সাধারণ কর্মীকে কয়েকজন সাগরেদ সহ রেল লাইনে দাঁড়িয়ে রেলের সম্পত্তি নষ্ট করার নকল ভিডিও তোলার সময় হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। যাদের উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ এক সম্প্রদায়ের বদনাম রটিয়ে সেই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে রাজ্যব্যাপি জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তোলা। এবং সেই একই সময়ে দেশের প্রধানকে নির্বাচনী সভায় গলা চড়িয়ে বলতে শোনা গিয়েছিল, পোশাক দেখেই নাকি অপরাধী চেনা যায়। সৌভাগ্যের কথা, সেই নির্বাচনে তাঁর দলকে রাজনৈতিক ভাবে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রাজ্যবাসী এইসব রাজনৈতিক নোংরামোর বিরুদ্ধেই সুষ্পষ্ট রায় জানিয়ে দিয়েছে।

মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২০

জেএনইউয়ে হামলা এবং পুলিশের ভুমিকা




জেএনইউয়ে হামলা এবং পুলিশের ভুমিকা

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে ভীত সন্ত্রস্ত শিক্ষার্থীরা যখন থানায় ফোন করে প্রাণরক্ষার জন্য পুলিশের কাছে সুরক্ষা চায়, তখন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পুলিশের কি কর্তব্য হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরেও যদি বিতর্ক গড়ে ওঠে, তবে বুঝতে হবে দেশের ভিতর অনৈতিকতার শিকড় অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে। দেশবাসীর একটা বড়ো অংশের ভিতর মানবিকতা নামক প্রকৃতির অপমৃত্যু হয়েছে। মনে রাখতে হবে, মাত্র কিছুদিন আগেই, সেই দিল্লীরই জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকে পুলিশি হামলায় শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে ছত্রভঙ্গ করার অপচেষ্টা হয়েছিল। এবং সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে থেকে ক্যাম্পাসে ঢোকার অনুমতি নেওয়ার অপেক্ষাও করে নি রাষ্ট্রের পুলিশ। অথচও এই পুলিশই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাণরক্ষার জন্য ফোন পেয়েও উপাচার্য্যের অনুমতির অপেক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে ঘন্টার পর ঘন্টা নিধিরাম সর্দারের মতো দাঁড়িয়ে থাকল। এবং ক্যাম্পাসের ভিতর বহিরাগত সন্ত্রাসীদের বেলাগাম হামলা চালিয়ে যেতে মদত দিল।

শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

এনপিআর



এনপিআর

এনপিআর অর্থাৎ ন্যাশানাল পপুলেশন রেজিস্টার। বাজেট বরাদ্দ হয়েছে আট হাজার পাঁচশ কোটি টাকা। এই টাকা শুধু মাত্র খরচ হবে দেশে বসবাসকারী মানুষের তথ্য ভাণ্ডার তৈরী করতে। না এমন নয়, সরকারের কাছে এই তথ্য ভাণ্ডার নাই। আছে। দশ বছর আগেই করা হয়েছিল প্রথম এনপিআর। দশ বছর অন্তর এই তথ্য ভাণ্ডার নবীন করণ করার নিয়ম। নিয়মটি করা হয়েছিল ২০০৩ সালের করা নাগরিক সংশোধনী আইনের নির্দেশ অনুসারে। সম্পূর্ণ অনুৎপাদক একটি খরচ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশবাসীর কাঁধে। দেশে প্রতি দশ বছর আদমসুমারী হয়। দেশের নির্বাচন কমিশনের কাছে সারা দেশের ভোটাধিকার প্রাপ্ত নাগরিকদের তথ্য ভাণ্ডার রয়েছে। রয়েছে আধার কার্ডে ধারণ করা প্রত্যেক নাগরিকের বিস্তৃত তথ্যও। তারপরেও আবার এনপিআর। এনপিআর হচ্ছে এনআরসি করার প্রথম ধাপ। কংগ্রেস দলের প্রকাশিত বিবৃতি অনুসারে, ২০১০ সালে কংগ্রেস সরকার প্রথম এনপিআর করে বুঝতে পারে, ভারতবর্ষের মতো দেশে পরের ধাপ এনআরসি তৈরী করা খুবই জটিল একটি বিষয়। তাই তারা এনপিআর করেই থেমে গিয়েছিল। কিন্তু সরকার আসে। সরকার যায়। নতুন সরকার তার নতুন এজেণ্ডা অনুসারে কাজ শুরু করে দেয়। আর ঠিক সেই কারণেই এবার যে এনপিআর করার জন্য ৮৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলো, তাতে যে সকল তথ্য আগের বারে নেওয়া হয়েছিল, তার সাথে আরও সাতটি নতুন তথ্য এবারে নেওয়া হবে। এবারে শুধু নিজের জন্ম তারিখ ও জন্মস্থান জানালেই হবে না। জানাতে হবে নিজের পিতামাতার জন্ম তারিখ ও জন্মস্থানের নামও। সাথে মোবাইল নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স, আধার নম্বর, ইত্যাদি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য।

বুধবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

ধর্ষণ ও জনতা




ধর্ষণ ও জনতা

সম্প্রতি ধর্ষণের অভিযোগে ধৃত চার যুবকের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুতে অধিকাংশ দেশবাসীই উল্লসিত। সকলেই সন্তুষ্ট এই ভেবে যে, এইবার অপরাধীরা সঠিক সাজা পেল। তারাই প্রকৃত অপরাধী কিনা, না সেই বিষয়ে কারুর মনে কোন সংশয় নাই। সংশয় নাই কারণ হাদ্রাবাদের এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট পুলিশ বাহিনী এই চার যুবককেই প্রকৃত অপরাধী বলে ঘোষণা করেছে। মানুষ পুলিশের ঘোষণাকেই আদালতের রায়ের সমগোত্রীয় বলে ধরে নিয়েছে। তাই এনকাউন্টারে অভিযুক্তদের মৃত্যু জনতার চোখে অপরাধীদের সঠিক শাস্তি বলেই মনে হয়েছে। বিশেষ করে হায়দ্রাবাদের সেই পশু চিকিৎসক তরুনীর মৃত্যুতে দেশব্যাপি তুমুল বিক্ষোভের পর এই এনকাউন্টারকেই মানুষ তাদের বিক্ষোভের জয় বলেই মনে করেছে।

ঠিক এই ঘটনার পরপরেই উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ের বিধায়কের বিরুদ্ধে ধর্ষণকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে আদালতের রায়ে। এবং দোষী সাব্যস্ত বিধায়কের যাবোজ্জীবন সাজাও ঘোষণা করা হয়েছে। এই সেই বিধায়ক যার বিরুদ্ধে অভিযোগকারিনী ধর্ষিতাকে মেরে ফেলার জন্য চক্রান্ত করার অভিযোগও রয়েছে। যে চক্রান্তে অভিযোগকারিনীর দুই আত্মীয়ার মৃত্যুও হয়েছে। মারাত্মক ভাবে আহত হতে হয়েছে অভিযোগকারিনী তাঁর উকিলকেও। প্রায় মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছেন তাঁরা দুজনেই দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে। অভিযোগ রয়েছে বিধায়কের প্রভাব খাটিয়ে ধর্ষিতার বাবকে পুলিশি হেফাজতে পিটিয়ে মেরে ফেলারও। এহেন প্রভাব প্রতিপত্তিশালী দুর্বৃত্ত বিধায়কের জন্য মাত্র ১৪ বছরের কারাদণ্ড?

যে উত্তাল বিক্ষোভ হায়দ্রাবাদের পুলিশি এনকাউন্টারকে দুহাত তুলে অভিনন্দিত করেছিল, সেই উত্তাল বিক্ষোভ মাত্র ১৪ বছরের কারাদণ্ডকে মেনে নিল কোন জাদুবলে? নাকি, রাস্তাঘাটের সাধারণ ধর্ষক আর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংসদ বিধায়ক ধর্ষকদের অপরাধের মাত্রা ভিন্ন রকমের? যে জনতা সাধারণ ধর্ষকের সাজার দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ দেখায়, সেই জনতাই রাজনৈতিক নেতারা ধর্ষণের দায়ে ধরা পড়লেও ঘরে বসে থাকে কোন জাদুতে্!

কপিরাইট পোস্টমর্টেম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯

উই ওয়ান্ট এনআরসি



উই ওয়ান্ট এনআরসি

আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। এবার এনআরসি হবে পশ্চিমবঙ্গে! সেই কারণেই চালু হয়ে গেল সিটিজিনশিপ এমেণ্ডমেন্ট এক্ট। আর সেই এক্টের সমর্থনে আপনি, “আমি এনআরসি চাই” প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে। গলায় গেরুয়া কাপড় ঝুলিয়ে। কারণ আপনি নিশ্চিন্ত। এনআরসি হলে আপনার নাম কাটা যাবে না। আপনি মুসলিম নন। আপনি অনুপ্রবেশকারী নন। আপনি হিন্দু। আপনি যাদের ভোট দিয়েছেন, তারাই রক্ষা করবে আপনাকে। হিন্দু-হিন্দী-হিন্দুস্তানের আপনিও একজন সমর্থক নিশ্চয়। একদেশ এক ধর্ম এক ভাষা। এমনটাই তো হওয়া চাই। তাই আজ খুশির দিন আপনার।

আপনি খুশি। কারণ মন্ত্রীমহাশয় বলে দিয়েছেন, আপনার ভোটার কার্ড আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র নয়। তেমনই, আপনার আধার কার্ড আপনার প্যান কার্ড আপনার রেশন কার্ড কোনটিই আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র নয়। অর্থাৎ ঘুরিয়ে বললে, আপনি ভারতবর্ষের নাগরিকই নন। কারণ, ভারতীয় নাগরিকত্বের কোন পরিচয়পত্র আপনার কাছে নাই। বাহবা। চমৎকার। অথচ দেখুন, কি রকম সারা দুপুর ঠা ঠা রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে আপনি একটি সরকার নির্বাচিত করে ফেললেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এমন অভিনব ঘটনা বোধকরি এই প্রথম। একটি গণতান্ত্রিক দেশের সরকার নির্বাচিত হলো অ-নাগরিক জনতার ভোটে। এবং সংবিধানের শপথ নিয়ে সরকার গঠন করে সেই নির্বাচিত সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, যে ভোটার আইডেন্টিটিকার্ড দেখিয়ে আপনি এই সরকারকে নির্বাচিত করেছেন, সেটি আদৌ আপনার ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র নয়। আপনি আরও খুশি হলেন জেনে যে, এইবার সরকার নাগরিকপঞ্জি বানাবেন। যে পঞ্জিতে নাম থাকলে তবেই একজন ভারতীয়, নাগরিক বলে গণ্য হবেন। খুব ভালো কথা। আপনিও আহ্লাদে আটখানা। এই তো অচ্ছে দিন এসে গেল। আপনি একবারও ভাবলেন না, আপনি এতদিন অর্থাৎ সারাজীবন তবে কোন দেশের নাগরিক হয়ে এই ভারতে বাস করলেন? আপনার একবারও মনে হলো না, একটি দেশের নাগরিক না হয়েও কি সেই দেশের সরকার নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা সম্ভব? আপনার একবারও মনে প্রশ্ন উঁকি দিল না, অ-নাগরিকের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কোন সাংবিধানিক বৈধতা থাকে কিনা?

রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

ভোটার কার্ড কি নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র নয়?




ভোটার কার্ড কি নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র নয়?


এ এক অদ্ভুত সময়। মিডিয়া যেমন বোঝাচ্ছে মানুষ তেমনই বুঝছে। মিডিয়া সেটাই বোঝাচ্ছে, সরকার যেটা বলছে। এর মধ্যে কোন ফাঁক নাই। মানুষের একটাই সুবিধা, কষ্ট করে কোন বিষয়ে চিন্তা করার দরকার নাই। এটাই এই সময়ের চিত্র। ফলে মানুষ একথা ভাবছে না, একজন নাগরিককে সরকার কি করে নাগরিকত্ব দেবে? সরকার তার মর্জি মতো তাকেই নাগরিকত্ব দিতে পারে, যে বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক নয়। কিন্তু মানুষ এটা ভাবতে চাইছে না, বর্তমানে কারা ভারতীয় নাগরিক নয়। কিংবা কারা কারা ভারতীয় নাগরিক। সোজা কথায় নাগরিক কাকে বলে, এই সহজ সরল প্রশ্নটাই হারিয়ে গিয়েছে বর্তমান ডামাডোল। মানুষ ভাবতে চাইছে না, যখন একটি রাজনৈতিক দল বলে, তোমরা আমাদের ভোট দাও, আমরা তোমাদের নাগরিকত্ব দেবো; তখন সেই রাজনৈতিক দল আসলেই মানুষকে চুড়ান্ত মুর্খই মনে করে। না হলে এমন আজগুবি কথা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোন দল বলতে পারে না। বলতে পারে তখনই, যখন সেই দল মানুষকে গোমুর্খ বলে ধরে নেয়। গণতান্ত্রিক রাষ্টব্যবস্থায়, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার অধিকার থাকে একমাত্র সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের বৈধ নাগরিকদেরই। তাহলে ভারতবর্ষে বৈধ নাগরিক কারা? না রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত ভোটার আইডেন্টি কার্ড যাদের হাতে রয়েছে, তারাই। অর্থাৎ সরকারী ভোটার লিস্টে যাদের নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে তারাই। তারাই ভারতীয় নাগরিক। সেই নাগরিককেই সরকার আবার কি করে নাগরিকত্ব দেবে? মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি কোন তলানিতে এসে পৌঁছালে, মানুষ এই নিয়ে প্রশ্ন তোলে না?

রবিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৯

সুপ্রীমকোর্টের রায় ও সংগত কিছু প্রশ্ন




সুপ্রীমকোর্টের রায় ও সংগত কিছু প্রশ্ন

সুপ্রীম কোর্টের রায়। তার উপর আর কথা চলে না। দেশের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ আদালতের রায় সর্বজন গ্রাহ্য। কিন্তু অযোধ্যায় রাম মন্দির বাবরি মসজিদ বিতর্কে সুপ্রীম কোর্টের এই রায় আমাদেরকে কিছু বিষয়ে ওয়াকিবহাল করে দিল। প্রথমতঃ, বাল্মীকি লিখিত মহাকাব্য রামায়ণের কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রী রামচন্দ্রের নামে সরকারী অর্থে একটি মন্দির নির্মাণের আদেশ অভূতপূর্ব একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। ভারতবর্ষের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে শিরোধার্য্য করা হয়েছে। তাসত্বেও এই রায় কতটা সাংবিধানিক, সেই বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে সম্পূর্ণ একটি কাল্পনিক চরিত্রের তথাকথিত জন্মস্থানের আইনী স্বীকৃতি কি করে সম্ভব?

দ্বিতীয়তঃ রামজন্মভূমির পক্ষে আদালত গ্রাহ্য কি কি আইনী প্রমাণ বর্তমান? বিশেষ করে শ্রী রামচন্দ্রের মতো একটি কাল্পনিক চরিত্রের? সাহিত্য আর ধর্ম, কল্পনা আর ইতিহাস সব একাকার হয়ে গেল সুপ্রীম কোর্টের এই একটি রায়তে। সাধারণ মানুষের কাছে সাহিত্যের কল্পকাহিনীকেই দেশের ইতিহাস বলে তুলে ধরার সুবন্দোবস্ত করে দিল এই রায়। বলতে গেলে এই রায় তারই আইনি স্বীকৃতি স্বরূপ।

তৃতীয়তঃ আদালত গ্রাহ্য আইনস্বীকৃত কোন প্রমাণ ছাড়াই কিন্তু বিতর্কিত জমিতে রামমন্দির নির্মাণের আদেশ দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মনে রাখতে হবে, এই রায়তেই স্পষ্ট বলা রয়েছে, বিতর্কিত জমিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের তলায় কোন রামমন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ কিন্তু পাওয়া যায় নি। যা পাওয়া গিয়েছে তাতে একথাও প্রমানিত হয় নি যে, সেখানে রাম মন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। বরং একথাই জানা যাচ্ছে, মাটির তলায় যা পাওয়া গিয়েছে তা ১২শ শতাব্দীর। যার চারশ বছর পর সেই স্থানে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে রামমন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ নির্মাণের কোন প্রমাণ কিন্তু আদালতের হাতেও নাই। চারশ বছর কিন্তু কম সময় নয়।

চতুর্থতঃ ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মতো অসাংবিধানিক ও সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধমূলক একটি কাজ জনমানসে নৈতিক বৈধতা পেয়ে গেল এই রায়তে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারবারীরা আজও আইনের নাগালের বাইরেই রয়ে গেল। এবং তাদের অপরাধেরও বিচার হলো না। সুপ্রীমকোর্টের অস্তিত্ব সত্বেও। জনমানসে ও এই দেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়বে মারাত্মক ভাবেই। অন্তত সেই সম্ভাবনাই প্রবল।

পঞ্চমতঃ রামমন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ নির্মাণের কোন আইনি ও ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া না গেলেও আজকে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের জমিতেই কিন্তু রামমন্দির নির্মাণের মতো অনৈতিক সিদ্ধন্ত গ্রহণ করা হলো। যেটি ভারতীয় সংবিধানের আইন ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।

ষষ্ঠতঃ যে কোন দেশের আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আইন কখনোই প্রমাণের অভাবে বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে না। কোন আদালত কোন মামলায় বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে কোন রায় দিতে পারে না। আদালতের কাছে আইনস্বীকৃত প্রমাণাদি ছাড়া কারুর বিশ্বাসের কোন মূল্য থাকতে পারে না। এটাই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যতম প্রাথমিক প্রকৃতি। কিন্তু সুপ্রীমকোর্টের এই রায়ে এই প্রাথমিক প্রকৃতিকেই অস্বীকার করা হয়েছে। এটা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা। সর্বোচ্চ আদলাত শুধু বলেছে, বিতর্কিত জমিটি শ্রীরামচন্দ্রের জন্মস্থান বলেই মানুষের বিশ্বাস। এবং সেই বিশ্বাসের নানাবিধ প্রমাণ আদালতের হাতে রয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ আদালতে জন্ম ও জন্মস্থানের প্রমাণ না থাকলেও লোকশ্রুতির বিশ্বাস সম্বন্ধে যথেষ্ঠ প্রমাণ থাকাটাই এই রায়ে মুখ্য বিচার্য্য বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। যার প্রতিফলন ঘটেছে সাম্প্রতিক এই রায়ে। গণতান্ত্রতিক একটি রাষ্ট্রে, যেখানে একটি আধুনিক সংবিধান রয়েছে, নির্দিষ্ট আইন রয়েছে, সেই রকম একটি রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ আদালতের এই রায় একেবারেই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী একটি ঘটনা সন্দেহ নাই।

ফলে রামমন্দির বাবরি মসজিদ মামলার এই রায় ভারতীয় গণতন্ত্রের উপর একটি আঘাত কিনা, আগামী ভবিষ্যতই সে কথা বলবে।

১০ই নভেম্বর ২০১৯

কপিরাইট পোস্টমর্টেম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত