রবিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৯

সুপ্রীমকোর্টের রায় ও সংগত কিছু প্রশ্ন




সুপ্রীমকোর্টের রায় ও সংগত কিছু প্রশ্ন

সুপ্রীম কোর্টের রায়। তার উপর আর কথা চলে না। দেশের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ আদালতের রায় সর্বজন গ্রাহ্য। কিন্তু অযোধ্যায় রাম মন্দির বাবরি মসজিদ বিতর্কে সুপ্রীম কোর্টের এই রায় আমাদেরকে কিছু বিষয়ে ওয়াকিবহাল করে দিল। প্রথমতঃ, বাল্মীকি লিখিত মহাকাব্য রামায়ণের কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রী রামচন্দ্রের নামে সরকারী অর্থে একটি মন্দির নির্মাণের আদেশ অভূতপূর্ব একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। ভারতবর্ষের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে শিরোধার্য্য করা হয়েছে। তাসত্বেও এই রায় কতটা সাংবিধানিক, সেই বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে সম্পূর্ণ একটি কাল্পনিক চরিত্রের তথাকথিত জন্মস্থানের আইনী স্বীকৃতি কি করে সম্ভব?

দ্বিতীয়তঃ রামজন্মভূমির পক্ষে আদালত গ্রাহ্য কি কি আইনী প্রমাণ বর্তমান? বিশেষ করে শ্রী রামচন্দ্রের মতো একটি কাল্পনিক চরিত্রের? সাহিত্য আর ধর্ম, কল্পনা আর ইতিহাস সব একাকার হয়ে গেল সুপ্রীম কোর্টের এই একটি রায়তে। সাধারণ মানুষের কাছে সাহিত্যের কল্পকাহিনীকেই দেশের ইতিহাস বলে তুলে ধরার সুবন্দোবস্ত করে দিল এই রায়। বলতে গেলে এই রায় তারই আইনি স্বীকৃতি স্বরূপ।

তৃতীয়তঃ আদালত গ্রাহ্য আইনস্বীকৃত কোন প্রমাণ ছাড়াই কিন্তু বিতর্কিত জমিতে রামমন্দির নির্মাণের আদেশ দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মনে রাখতে হবে, এই রায়তেই স্পষ্ট বলা রয়েছে, বিতর্কিত জমিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের তলায় কোন রামমন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ কিন্তু পাওয়া যায় নি। যা পাওয়া গিয়েছে তাতে একথাও প্রমানিত হয় নি যে, সেখানে রাম মন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। বরং একথাই জানা যাচ্ছে, মাটির তলায় যা পাওয়া গিয়েছে তা ১২শ শতাব্দীর। যার চারশ বছর পর সেই স্থানে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে রামমন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ নির্মাণের কোন প্রমাণ কিন্তু আদালতের হাতেও নাই। চারশ বছর কিন্তু কম সময় নয়।

চতুর্থতঃ ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মতো অসাংবিধানিক ও সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধমূলক একটি কাজ জনমানসে নৈতিক বৈধতা পেয়ে গেল এই রায়তে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারবারীরা আজও আইনের নাগালের বাইরেই রয়ে গেল। এবং তাদের অপরাধেরও বিচার হলো না। সুপ্রীমকোর্টের অস্তিত্ব সত্বেও। জনমানসে ও এই দেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়বে মারাত্মক ভাবেই। অন্তত সেই সম্ভাবনাই প্রবল।

পঞ্চমতঃ রামমন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ নির্মাণের কোন আইনি ও ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া না গেলেও আজকে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের জমিতেই কিন্তু রামমন্দির নির্মাণের মতো অনৈতিক সিদ্ধন্ত গ্রহণ করা হলো। যেটি ভারতীয় সংবিধানের আইন ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।

ষষ্ঠতঃ যে কোন দেশের আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আইন কখনোই প্রমাণের অভাবে বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে না। কোন আদালত কোন মামলায় বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে কোন রায় দিতে পারে না। আদালতের কাছে আইনস্বীকৃত প্রমাণাদি ছাড়া কারুর বিশ্বাসের কোন মূল্য থাকতে পারে না। এটাই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যতম প্রাথমিক প্রকৃতি। কিন্তু সুপ্রীমকোর্টের এই রায়ে এই প্রাথমিক প্রকৃতিকেই অস্বীকার করা হয়েছে। এটা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা। সর্বোচ্চ আদলাত শুধু বলেছে, বিতর্কিত জমিটি শ্রীরামচন্দ্রের জন্মস্থান বলেই মানুষের বিশ্বাস। এবং সেই বিশ্বাসের নানাবিধ প্রমাণ আদালতের হাতে রয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ আদালতে জন্ম ও জন্মস্থানের প্রমাণ না থাকলেও লোকশ্রুতির বিশ্বাস সম্বন্ধে যথেষ্ঠ প্রমাণ থাকাটাই এই রায়ে মুখ্য বিচার্য্য বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। যার প্রতিফলন ঘটেছে সাম্প্রতিক এই রায়ে। গণতান্ত্রতিক একটি রাষ্ট্রে, যেখানে একটি আধুনিক সংবিধান রয়েছে, নির্দিষ্ট আইন রয়েছে, সেই রকম একটি রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ আদালতের এই রায় একেবারেই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী একটি ঘটনা সন্দেহ নাই।

ফলে রামমন্দির বাবরি মসজিদ মামলার এই রায় ভারতীয় গণতন্ত্রের উপর একটি আঘাত কিনা, আগামী ভবিষ্যতই সে কথা বলবে।

১০ই নভেম্বর ২০১৯

কপিরাইট পোস্টমর্টেম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত



কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন