রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

ভোটার কার্ড কি নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র নয়?




ভোটার কার্ড কি নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র নয়?


এ এক অদ্ভুত সময়। মিডিয়া যেমন বোঝাচ্ছে মানুষ তেমনই বুঝছে। মিডিয়া সেটাই বোঝাচ্ছে, সরকার যেটা বলছে। এর মধ্যে কোন ফাঁক নাই। মানুষের একটাই সুবিধা, কষ্ট করে কোন বিষয়ে চিন্তা করার দরকার নাই। এটাই এই সময়ের চিত্র। ফলে মানুষ একথা ভাবছে না, একজন নাগরিককে সরকার কি করে নাগরিকত্ব দেবে? সরকার তার মর্জি মতো তাকেই নাগরিকত্ব দিতে পারে, যে বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক নয়। কিন্তু মানুষ এটা ভাবতে চাইছে না, বর্তমানে কারা ভারতীয় নাগরিক নয়। কিংবা কারা কারা ভারতীয় নাগরিক। সোজা কথায় নাগরিক কাকে বলে, এই সহজ সরল প্রশ্নটাই হারিয়ে গিয়েছে বর্তমান ডামাডোল। মানুষ ভাবতে চাইছে না, যখন একটি রাজনৈতিক দল বলে, তোমরা আমাদের ভোট দাও, আমরা তোমাদের নাগরিকত্ব দেবো; তখন সেই রাজনৈতিক দল আসলেই মানুষকে চুড়ান্ত মুর্খই মনে করে। না হলে এমন আজগুবি কথা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোন দল বলতে পারে না। বলতে পারে তখনই, যখন সেই দল মানুষকে গোমুর্খ বলে ধরে নেয়। গণতান্ত্রিক রাষ্টব্যবস্থায়, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার অধিকার থাকে একমাত্র সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের বৈধ নাগরিকদেরই। তাহলে ভারতবর্ষে বৈধ নাগরিক কারা? না রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত ভোটার আইডেন্টি কার্ড যাদের হাতে রয়েছে, তারাই। অর্থাৎ সরকারী ভোটার লিস্টে যাদের নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে তারাই। তারাই ভারতীয় নাগরিক। সেই নাগরিককেই সরকার আবার কি করে নাগরিকত্ব দেবে? মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি কোন তলানিতে এসে পৌঁছালে, মানুষ এই নিয়ে প্রশ্ন তোলে না?


আসলে মানুষ যে এতটাই মুর্খ, তাও হয়তো নয়। কারণ মানুষ দেখছে, আসামে একটি হিন্দুত্ববাদী দল ঠিক এই প্রতিশ্রুতি প্রচার করেই অধিকাংশ হিন্দু বাঙালির ভোটে নির্বাচিত হয়ে, সেই ভোটারদেরই নাগরিকত্ব নাকচ করে দিয়েছে। ফলে আতঙ্কিত শঙ্কিত মানুষ আজ আর সোজা প্রশ্নটা নিয়ে চিন্তা করার মতো অবস্থানেই নাই। সে সদা শঙ্কিত, এই বুঝি সরকার তার বৈধ নাগরিকত্ব কেড়ে নিল। তাই সে সেই সরকারের বুলির উপরেই ভরসা রাখতে চাইছে। বিশ্বাস করতে চাইছে, নাগরিকত্ব কেড়ে নিলেও, যদি আবার অন্য কোন পথে নতুন করে নাগরিকত্ব দেয়। এই হল বর্তমান জনমানসের বুদ্ধির দৌড়। মানুষ এই কথাটিও চিন্তা করতে অপরাগ আজ, যে কোন বৈধ সরকারই একজন বৈধ নাগরিকের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারে না। যদি না সে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশদ্রোহীতার মতো গর্হিত কাজে সামিল হয়। আবার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, সরকারের ভোটার লিস্টে নাম থাকা প্রত্যেকেই সেই রাষ্ট্রের বৈধ নাগরিক। ফলে কোন ভাবেই সেই বৈধ নাগরিকদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া যেতে পারে না। পারে না সংবিধান স্বীকৃত গোন গণতন্ত্রেই। একমাত্র স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এই সম্ভব। স্বৈরতন্ত্র কোন নিয়ম নীতি সংবিধানের তোয়াক্কা করে না। স্বৈরতন্ত্রে বাহুবলই শেষ কথা। আর্থাৎ মিলিটারি শক্তি যার হাতে থাকবে, সে নিজের মর্জি মতো যাখুশি করতে পারে। তার মর্জিই দেশের আইন।

কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর গণতান্ত্রিক ভারতে সেটি হয় নি আজ অব্দি। নাগরিকের অধিকার রক্ষায় বিগত প্রায় সব সরকারই প্রতিশ্রুতি বদ্ধ ছিল। সমস্যা হয় নি কারুর। একমাত্র ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার কালে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলি অনেকাংশেই খর্ব করা হয়েছিল। তবুও কারুর নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মতো কোন ঘটনা ঘঠেছে বলে জানা যায় নি। কিন্তু সেই জরুরী অবস্থার সময়ও মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তি আজকের মতো অবরুদ্ধ হয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় নি। যায়নি বলেই দোর্দোণ্ড প্রতাপ ইন্দিরা গান্ধীকেও মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছিল ভারতীয় গণতন্ত্রের কাছেই।

অথচ আজকের এই একবিংশ শতকের ভারতবর্ষে সাধারণ জানমানসের অসাধারণ ভাবেই চিন্তাশক্তির অভাব দেখা দিয়েছে। চিন্তার দৈন্যতায়, সে চোখে নানাবিধ ঠুলি পড়ে বসে আছে। আর নির্ভর করছে সরকার নিয়ন্ত্রীত মিডিয়ার ভাষ্যের উপর। তাই সে আর প্রশ্ন করছে না। সে বলছে না, আমার তো ভোটার লিস্টেই নাম আছে। আমার হাতে রয়েছে ভোটার আইডেন্টিটি কার্ড। আমি এতগুলি সরকারী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি। আমার ভোটেই জয় পরাজয় নির্বাচিত হয়েছে প্রার্থী ও সরকারের। একটি গণতান্ত্রিক দেশে থেকে আমি তো একজন নাগরিক হিসাবে আমার সকল মৌলিক অধিকারই ভোগ করে আসছি এতদিন। তাহলে আমার নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে কেন আমাকেই? কেন আমাকে শঙ্কিত হতে হবে নিজের বৈধ নাগরিকত্ব থাকবে কি থাকবে না তাই নিয়ে? কেন আমাকে খোঁজ নিতে হবে, নাগরিকত্ব চলে গেলে, কোন কোন ধারায় তা পুনরায় ফিরে পাওয়া যেতে পারে? ও কোন পদ্ধতিতে।

আসলে রাষ্ট্র এখানে মানুষকে ভাগ করে ফেলেছে, মানুষের সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে। যা মূলত ধর্ম নির্ভর। মানুষ তার ধর্মীয় অডিটেন্টিটির উপর নির্ভর করেই সরকার নিয়ন্ত্রীত মিডিয়ার ভাষ্যে আস্থা রাখছে। এখানেই মানুষের মূল বিপদ। আর সেখানেই সে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন। সে আর জনতা নয়। সে এখন সম্প্রদায়। নিজের আত্মপ্রত্যয়ে সে আর নিজেকে দেশের নাগরিক হিসাবে দেখছে না। দেখছে নিজের সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের গন্ডীতে। এই ভাবে, সে তার নিজের মৌলিক অধিকারকে, নিজেই খর্ব করে রেখে দিচ্ছে একেবারে প্রথমেই। ফলে ঠিক এই কারণেই তার চিন্তাশক্তিকে বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা এতো সহজ হয়ে গিয়েছে রাষ্ট্র শক্তির পক্ষে।

ভোটার কার্ড, পাসপোর্ট, আধারকার্ড, প্যানকার্ড, এতসব রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র থাকতেও, মিডিয়া মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তোমার নাগরিকত্ব চলে গেলেও তোমার সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তোমাকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। তাই জনতার একটি বড়ো অংশ, যারা দেশে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় তারা সত্যি নিশ্চিন্ত বোধ করছে। ঠিক যেমন নিশ্চিন্ত বোধ করেছিল, আসামের কোটি কোটি বাঙালি হিন্দু। কেউ একবারের জন্যেও প্রশ্ন করছে না, আরে আমার বৈধ ভোটারকার্ড থাকা সত্বেও, ভোটাধিকার প্রাপ্ত একজন ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্বেও আমার নাগরিকত্ব কেড়ে নেবে কেন? কোন নীতিতে? এই দেশে এমন তো কোন আইন নাই। তাহলে? আসল গল্পটা কি?

এই আসল গল্পটুকুর অনুসন্ধান না করলে, এই পথেই সংবিধান স্বীকৃত ভারতীয় গণতন্ত্র খুব দ্রুত স্বৈরতন্ত্রের যাঁতাকলে আটকিয়ে যাবে।

১৭ই ডিসেম্বর ২০১৯


কপিরাইট পোস্টমর্টেম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত


কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন