শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯

উই ওয়ান্ট এনআরসি



উই ওয়ান্ট এনআরসি

আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। এবার এনআরসি হবে পশ্চিমবঙ্গে! সেই কারণেই চালু হয়ে গেল সিটিজিনশিপ এমেণ্ডমেন্ট এক্ট। আর সেই এক্টের সমর্থনে আপনি, “আমি এনআরসি চাই” প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে। গলায় গেরুয়া কাপড় ঝুলিয়ে। কারণ আপনি নিশ্চিন্ত। এনআরসি হলে আপনার নাম কাটা যাবে না। আপনি মুসলিম নন। আপনি অনুপ্রবেশকারী নন। আপনি হিন্দু। আপনি যাদের ভোট দিয়েছেন, তারাই রক্ষা করবে আপনাকে। হিন্দু-হিন্দী-হিন্দুস্তানের আপনিও একজন সমর্থক নিশ্চয়। একদেশ এক ধর্ম এক ভাষা। এমনটাই তো হওয়া চাই। তাই আজ খুশির দিন আপনার।

আপনি খুশি। কারণ মন্ত্রীমহাশয় বলে দিয়েছেন, আপনার ভোটার কার্ড আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র নয়। তেমনই, আপনার আধার কার্ড আপনার প্যান কার্ড আপনার রেশন কার্ড কোনটিই আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র নয়। অর্থাৎ ঘুরিয়ে বললে, আপনি ভারতবর্ষের নাগরিকই নন। কারণ, ভারতীয় নাগরিকত্বের কোন পরিচয়পত্র আপনার কাছে নাই। বাহবা। চমৎকার। অথচ দেখুন, কি রকম সারা দুপুর ঠা ঠা রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে আপনি একটি সরকার নির্বাচিত করে ফেললেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এমন অভিনব ঘটনা বোধকরি এই প্রথম। একটি গণতান্ত্রিক দেশের সরকার নির্বাচিত হলো অ-নাগরিক জনতার ভোটে। এবং সংবিধানের শপথ নিয়ে সরকার গঠন করে সেই নির্বাচিত সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, যে ভোটার আইডেন্টিটিকার্ড দেখিয়ে আপনি এই সরকারকে নির্বাচিত করেছেন, সেটি আদৌ আপনার ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র নয়। আপনি আরও খুশি হলেন জেনে যে, এইবার সরকার নাগরিকপঞ্জি বানাবেন। যে পঞ্জিতে নাম থাকলে তবেই একজন ভারতীয়, নাগরিক বলে গণ্য হবেন। খুব ভালো কথা। আপনিও আহ্লাদে আটখানা। এই তো অচ্ছে দিন এসে গেল। আপনি একবারও ভাবলেন না, আপনি এতদিন অর্থাৎ সারাজীবন তবে কোন দেশের নাগরিক হয়ে এই ভারতে বাস করলেন? আপনার একবারও মনে হলো না, একটি দেশের নাগরিক না হয়েও কি সেই দেশের সরকার নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা সম্ভব? আপনার একবারও মনে প্রশ্ন উঁকি দিল না, অ-নাগরিকের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কোন সাংবিধানিক বৈধতা থাকে কিনা?


না প্রশ্ন করা বড়ো খাটুনির বিষয়। তার থেকে, নিজ নিজ সাম্প্রদায়িক বিশ্বাসকে মেনে চলা অনেক বেশী আরামের বিষয়। আরও আনন্দের বিষয় সাম্প্রদায়িক স্বার্থ রক্ষায়, রাজনৈতিক নেতাদের ভাষণে কোন দিকে সুর্য উঠলো সেটি জেনে নেওয়া। সেই মতো সেই দিকে তাকিয়ে যেকোন বিষয় বুঝে নিতে পারলেই ঠিক বোতামে ঠিক সময়ে টিপ দিয়ে ভোট দিতে কোন অসুবিধাই হয় না। না, আপনারও হয় নি।

তাহলে, আপনি আজকের তারিখেও ভারতীয় নাগরিক নন। মন্ত্রী মহয়শয়ের কথা মতো, আপনার ভোটার আইডেন্টিটিকার্ড আপনার নাগরিকত্বের পরিচয় বহন করছে না। এবার আপনি চাইছেন এনআরসি হোক। সেটি হলেই আপনি ভারতীয় নাগরিক হয়ে যাবেন। স্বাধীনতার আট দশক পরে। বা আপনার জন্মের এতদিন পরে। দেরি হয়েছে তো ক্ষতি কি? কথায় বলে সবুরে মেওয়া ফলে। এখন আসুন তবে দেখে নেওয়া যাক। কি কি মেওয়া ফলতে পারে।

এনআরসি হবে। হবেই। আসামে হয়েছে। করদাতাদের শতশত কোটি টাকা খরচ করে। সরকারী কর্মীদের হাজার হাজার ঘন্টা সময় খরচে করে। না তাতে দেশের সময় ও সম্পদ নষ্ট হয় নি। এমনটাই বিশ্বাস আপনার। এবার সারা ভারতে হোক না হোক, আপনার জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গে তো হতেই হবে। সেইজন্যেই তো আপনি “এনআরসি চাই” প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে। আপনি জানেন এনআরসি তালিকায় নাম তুলতে গেলে আপনার ভোটার আইডেন্টিটিকার্ড একটি ফালতু কাগজের মতোই কোন কাজে লাগবে না। না লাগুক। আপনিও তো সেটাই চান। না হলে অনুপ্রবেশকারী ধরবেনই বা কি করে? আর তাড়াবেনই বা কি করে? ওদেরও যে ভোটারকার্ড আছে। জানেন আপনি। সেইরকমই আধার কার্ড, প্যানকার্ড, রেশন কার্ড। হেন কার্ড তেন কার্ড কোন কার্ডেই এনআরসিতে আপনার নিজ নাম তোলা যাবে না। তাহলে কি হবে? না আপনার জন্মের সার্টিফিকেট আছে। আপনার স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট আছে। আপনিতো আর অশিক্ষিত নন আপামর জনতার মতো। যারা এনআরসি’র বিপক্ষে পথে নেমেছে। আপনার চিন্তা কি? আপনি এনআরসি’র লাইনে গিয়ে দাঁড়াবেন নিশ্চিন্তে। কিন্তু তারপরই হটাৎ জানতে পারবেন, আপনার জন্মের সার্টিফিকেট দাখিল করলেই আপনার ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হবে না। দাখিল করতে হবে ১৯৪৮ সালের আগের জমি বাড়ির দলিল, আপনার বাবা ও মায়ের জন্মের নথি। আপনিই যে তাঁদের সন্তান, তার প্রমাণপত্র। আপনার বাবা ও মা দুজনাই যে ভারতের মাটিতে জন্মিয়েছেন তার প্রমানপত্র। ইত্যাদি আরও অনেক বৈধ সরকারী নথি। যেগুলির বয়স হতে হবে প্রায় আশি বছরের পুরানো।

না, আপনি হঠাৎ দেখলেন, এইসব প্রাগৈতিহাসিক নথি তো আপনার কাছে নাই। অর্থাৎ আপনার সাধের এনআরসিতে ভারতীয় নাগরিক হিসাবে আপনার নাম নথিভুক্তি হলো না। বেশ তো। হলো না তো হলো না। কি হলো তাতে। কারণ আপনি জানেন। আপনি হিন্দু। একজন হিন্দুরও নাম এনআরসি থেকে বাদ যাবে না। এমনটাই শুনেছেন আপনি, আপনার একান্ত বিশ্বাসে ভরসা করে। এই কারণেই তো সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট এক্ট চালু করেছে আপনার সরকার। কারণ আপনার মতো হিন্দুকেই ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্যেই এই আইন।

এবার আপনি ছুটবেন ফরেনার্স ট্রাইবুনালে। এবার আপনাকে প্রমাণ দাখিল করতে হবে, আপনি আফগানিস্তান পাকিস্তান কিংবা অধুনা বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত নির্যাতিত হয়ে পালিয়ে এসেছেন এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে। আপনার চিন্তা কি। আপনি হিন্দু। সরকার তো এই পালিয়ে আসা অত্যাচারিত হিন্দুদেরকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্যেই এত কাঠখড় পুড়িয়ে, এত প্রতিবাদ প্রতিরোধ অতিক্রম করে এই আইন চালু করেছেন।

কিন্তু এইবার প্রথম আপনি একটা রাম ঝটকা খাবেন। খেতেই হবে। সে আপনি যত বড়ো রামভক্তই হোন না কেন। সরকারী আইন মোতাবেক প্রয়োজনীয় নথি আপনি আজকে কিভাবে জোগার করবেন, ঐ আফগানিস্তান পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ থেকে? এই ভারতে বসে? তাও আবার ২০১৪’র ৩১শে ডিসেম্বরের আগেকার? এবার দেখুন আপনি কিন্তু এনআরসি’র তালিকায় নিজের নাম নথিভুক্ত করার সময় নিজেকে ভারতীয় নাগরিক বলে দস্তখত করেছিলেন। আবার আজ নিজেকে শরণার্থী প্রমাণ করার সময় আপনি যদি আবার নিজেকে ভারতীয় নাগরিক নন অর্থাৎ ভারতবর্ষে আশ্রয়প্রার্থী বলে দস্তখত করেন, তবে কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে মিথ্যাচারের দায়ে ভারতীয় আইন মোতাবেক আপনি অপরাধী বলে প্রমাণিত হবেন। ও আদালত প্রদত্ত শাস্তির কবলে পড়বেন।

এবার প্রথমে আপনার ঠিকানা হবে ভারতবর্ষের যেকোন শ্রীঘরে। শাস্তির মেয়াদ একদিন শেষ হবে। হলেই আপনার ঠাঁই হবে, আজ যে ডিটেনশন ক্যাম্পগুলি তৈরী হচ্ছে নানান রাজ্যে, তারই কোন একটিতে। এই পর্বে, আপনি কি কি হারাবেন একবার মিলিয়ে দেখে নিন বরং। আপনার স্বাধীনতা। নিজের জমি বাড়ি সম্পত্তির উপর ভোগদখলের অধিকার। ব্যাংকে জমানো নিজের টাকা তোলার অধিকার। ভারতবর্ষে চাকুরী, ব্যবসা ইত্যাদিসহ, কোন ধরণের অর্থ উপার্জনের অধিকার। সারা দেশে স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার। শিক্ষা ও স্বাস্থসুরক্ষার অধিকার। বাকস্বাধীনতার অধিকার। আন্দোলন করার অধিকার। সিটিজেনশিপ এমেণ্ডমেন্ট এক্ট ২০১৯ এর বলে, এইভাবে ডিটেনশন ক্যাম্পে আপনাকে কাটাতে হবে কম করে ছয় বছর।

এই ছয় বছরের পর আপনাকে হয়তো আবার ফরেনার্স ট্রাইবুনালে শরনার্থী হিসাবে ভারতে আশ্রয় পাওয়ার জন্য আবেদন করার একটি সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু সেই এক শর্তেই। অর্থাৎ আপনাকে প্রমাণ করতে হবে, আপনি ২০১৪এর ৩১শে ডিসেম্বরের আগে আফগানিস্তান, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত কিংবা নির্যাতিত হয়ে পালিয়ে এসে অবৈধ ভাবে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছেন। সেই প্রমাণ যদি দাখিল করতে পারলেন তো একরকম। না পারলে ফিরতে হবে আবার সেই ডিটেনশন ক্যাম্পেই। থাকতে হবে নিয়তি নির্দেশিত দিন অব্দি। আর প্রমাণ করতে পারলে, অপেক্ষা করতে হবে, কত বছর পরে কিভাবে পাবেন সেই ভারতীয় নাগরিকত্ব। তুলতে পারবেন আপনার সেই সাধের এনআরসিতে পিতৃদত্ত নামটি। যার জন্যেই আজ এনআর সি চাই প্ল্যাকার্ড হাতে আপনি সামিল হয়েছেন রাজপথে। জয়শ্রীরাম বলে। আপনি জানেন আপনি পারবেন, কারণ আপনি হিন্দু। হিন্দু হিন্দী হিন্দুস্তানের স্বপ্নে মশগুল। ঠিক যেটি একজন মুসলিম পারবেন না বলেই না, আজ আপনি আহ্লাদে আটখানা হয়ে সিএএ’র সমর্থনে পা মিলিয়েছেন সারা ভারতবর্ষের উত্তাল জনমত উপেক্ষা করে।

২০ ডিসেম্বর ২০১৯

কপিরাইট পোস্টমর্টেম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন