বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২০

বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতি



বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতি

সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেশের মানুষের উপর অর্থনৈতিক শোষণ চালানো একটি রাজনৈতিক কার্যক্রম। বর্তমানে ভারতবর্ষের রাজনীতিতে এই কার্যক্রমের সফল প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে অনেকটাই। ক্ষমতার অপব্যবহারেও, এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের প্রয়াস খুবই কার্যকর একটি পদক্ষেপ। শুধুই রাজনৈতিক ভাষণের ভিতর দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো নয়, সরকারী আইন প্রয়োগ করেও এই বিদ্বেষ ছড়ানোর অপপ্রয়াস দেখা যাচ্ছে। আর তারই প্রতিবাদে, সমাজের শুভবোধ সম্পন্ন মানুষ আজকে পথে নামা শুরু করেছে। সংবিধান বিরোধী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনকে হাতিয়ার করে ভারতব্যাপি যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সুখের কথা দেশের ছাত্রসমাজ প্রথমেই তার বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছে। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নারীসমাজের একটি বড়ো অংশ। এর ফলেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ এবং দেশ ব্যাপি এন আর সি ও এন পি আর চালু করার বিরুদ্ধে আসমুদ্র হিমাচল ছাত্র যুবা নারী পথে নেমে প্রতিবাদ শুরু করেছে। সরকার পক্ষ থেকে সেই সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে দ্রুত ফলপ্রসু করে তোলার জন্য যাবতীয় প্রয়াস জারি রয়েছে। আর সেই উদ্দেশেই আন্দোলনরত জনগণের উপর দেশবিরোধী রাষ্ট্রবিরোধী ও বিশ্বাসঘাতক তকমা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জনগণের ভিতর সরকারপন্থীদেরকে নানা ভাবে উস্কানী দেওয়া হচ্ছে সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর উদ্দেশে। এই প্রয়াসে রাজনৈতিক নেতানেত্রী, মন্ত্রী আমলা সকলকেই কাজে লাগানো হচ্ছে খুব নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক।


দিল্লীর আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যেও এই সাম্প্রদায়িক রজানীতির তাস খেলা হচ্ছে অত্যন্ত সুপরিকল্পনা করে। দিল্লীর বিধানসভা দখল উপলক্ষ্য হলেও, মূল লক্ষ্য সেই দেশব্যাপি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাধ্যমে আসমুদ্রহিমাচল মানুষের উপর স্বচ্ছন্দে অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়ে যাওয়া। খুব স্বাভাবিক ভাবেই দেশের অধিকাংশ মানুষ এতকিছু গূঢ় বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকে না। আর সেইটিই ক্ষমতা অপব্যবহার করে দেশ লুন্ঠন করার কাজে তুরুপের তাস হয়ে ওঠে। এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনই এও সত্য যে, আজকে ভারতবর্ষের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর একটা বড়ো অংশই এই বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। শুধু সচেতনই নয়, তারা প্রতিরোধ প্রতিবাদেও অজুতোভয় এবং সরব হয়ে উঠছে প্রতিদিন। অভাবনীয় ভাবে এই ছাত্র সামজের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে নারী সমাজের একটি বড়ো অংশ। এবং সংবিধান বিরোধী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ এই অভাবনীয় ঘটনার প্রধান অনুঘটক।

এখন দেশব্যপি অর্থনৈতিক শোষণ চালানোর পরিকল্পনায়, ছাত্র ও নারী সমাজের এই উত্থান প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা অশুভশক্তির। ফলে যেভাবেই হোক না কেন, এই ছাত্র ও নারী সমাজকে দেশদ্রোহী রাষ্ট্রদোহী এবং বিশ্বাসথাতক বলে প্রচারের অশুভ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে। রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের মঞ্চজুড়ে বিদ্বেষমূলক ভাষণের এটিই নেপথ্য কারণ। এইভাবে সুচতুর পদ্ধতিতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে  ছড়াতে ছড়াতে ভারতবর্ষকে নতুন করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনে ভাগ করতে পারলেই ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা নিঃশঙ্ক হবে বলেই বিশ্বাস এই পরিকল্পনার কুশীলবদের। আর ক্ষমতার কেন্দ্রে যতদিন বেশি থাকা যাবে দেশব্যপি জনগণের উপর অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়ে যাওয়া মাখনের ভিতর দিয়ে ছুরি চালানোর মতোই সহজ হয়ে যাবে।

আজকে দিল্লীর জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের উপর পুলিশের উপস্থিতিতেই গুলি চালানের ঘটনা এরই সরাসরি প্রভাবে ঘটছে। আজকের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা বলে মনে করার উপায় নাই। এই ধরণের ঘটনা যে এখানেই শেষ হয়ে যাবে, বিষয়টা তাও নয়। বরং এই ধরণের ঘটনায় প্ররোচনা দেওয়ার কাজটি আরও ব্যাপক ভাবেই বৃদ্ধি পাবে। আজকের ঘটনায় পুলিশের ভুমিকাই এই ছবিটা স্পষ্ট করে বোঝার জন্য যথেষ্ট। এখন দেখার বিষয়, দেশের জাগ্রত জনমানস বিশেষত নিরন্তর প্রতিবাদরত ছাত্র ও নারী সমাজ তাদের আন্দোলনকে কিভাবে প্রবল থেকে প্রবলতর করে তোলে। এবং বাকি জনমানসে কতটা সদর্থক প্রভাব পড়ে। দেখতে হবে, ক্ষমতার অক্ষে থাকা প্রবল প্রতিপক্ষ কিভাবে সমগ্র বিষয়টি মোকাবিলায় অগ্রসর হয়।

৩০শে জানুয়ারী’ ২০২০

কপিরাইট পোস্টমর্টেম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত



কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন