বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

দাঙ্গা বিদ্ধস্ত দিল্লী




দাঙ্গা বিদ্ধস্ত দিল্লী

ঘটনার তিনদিনের মাথায় মৃত ২৩ জন। আহত ১৮০ হন। সরকারি তথ্যমাত্র। প্রকৃত অবস্থা এখনো পরিস্কার নয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কল্পনার অতীত। না, ঘটনা হঠাৎ করে ঘটে নি। খুব ভালো করে পরিকল্পনা করেই ঘটানো হয়েছে। ঘটানো হয়েছে কেন, সেটি ঘটনা পরম্পরা ভালো করে পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে। বাস্তবে অনভিপ্রেত, বিশেষ করে হিংসাত্মক ঘটনাগুলির পর, যে পক্ষ অধিকত সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছিয়ে যায়, যে পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়, বুঝতে হবে ঘটনার পিছনে মূল পরিকল্পনায় তাদেরই মদত থাকা স্বাভাবিক। এমনটাই সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গিয়েছে দেশে বিদেশে। সে গুজরাট দাঙ্গাই হোক। গোধরা কাণ্ডই হোক। টুইন টাওয়ার ধ্বংসই হোক। পুলওয়ামার মৃত্যু মিছিলই হোক্, দেখতে হবে প্রতিটি ঘটনার ফলে কোন পক্ষের স্বার্থ অধিকতর সুরক্ষিত হয়েছে। কোন পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি দ্রুততর বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তখন আর এটা বোঝা দুঃসাধ্য হবে না, মূল ঘটনাগুলি কাদের স্বার্থে ঘটানো হয়েছিল। প্রতিটি ঘটনা পরিকল্পিত ভাবে ঘটনোর পিছনে কিছু স্বার্থ জড়িত থাকে। ঘটনার অব্যবহিত পরেই যে সেটি সবসময় পরিস্কার ধরা পড়ে তা নাও হতে পারে। কিন্তু সময়ের সাথে, ঘটনার ফলে কোন পক্ষ অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছিয়ে যায়, সেটি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তখন কোন রহস্যই আর রহস্য থাকে না।


রাতের অন্ধকারে ট্রাক বোঝাই পাথরের টুকরো এনে রাজপথের ধারে জমা করার পরিকল্পনা একদিনের নয়। সাধারণত রাস্তায় পুলিশের টহলদারিতেই এই ঘটনা ধরা পড়ার কথা ছিল। উচিত ছিল পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্ক হয়ে যাওয়ার। কিন্তু সেরকম কোন ঘটনাই ঘটেনি। ঘটলে পরদিন পাথরবৃষ্টি করে উত্তেজনা ছড়িয়ে তোলা যেত না। একাধিক ভিডিওয়তে পরিস্কার দেখা গিয়েছে, পাথরবাজদের সহায়তায় দিল্লী পুলিশের কার্যকর ভুমিকা। রাস্তায় পড়ে থাকা ক্ষত বিক্ষত নিরস্ত্র আহত নাগরিকদের উপর পুলিশি জুলুম ও অত্যাচারের ভিডিও দেখা যাচ্ছে অনলাইনে। রাস্তার সিসিটিভি ধংস করার দায়িত্বেও দিল্লী পুলিশকে দেখা গিয়েছে সচেতন নাগরিকের ক্যামেরায়। পরিকল্পিত ভাবে সংবাদ মাধ্যমকেও কাজ করতে দেওয়া হয়নি। ক্যামেরা ভেঙে দেওয়ার সাথে সাথে সাংবাদিকদের উপরেও আঘাত নেমে এসেছে অনেকের ক্ষেত্রেই।  এগুলি কোনটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নয় হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া ঘটনা। সবটিই একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশমাত্র। বিশেষ করে সময়টি নির্বাচন করা হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভারত ভ্রমণের সময়েই। এবং ঘটনাস্থলে সময় মতো যথেষ্ট পুলিশবাহিনী পাঠাতে না পারার কারণ হিসাবে প্রশাসন থেকেই অজুহাত হিসাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার কারণটিই তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে। ফলে সময় নির্বাচন এই ঘটনার নেপথ্যে গৃহীত পরিকল্পনার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যমূলক বিষয়।

লক্ষ্য করে দেখতে হবে, ভয়াবহ এই হিংসাত্মক ঘটনা ঘটনাও হয়েছে, দিল্লীর সেই সেই অঞ্চলেই। যেখানে মুসলিম জনবসতির ঘনত্ব তুলনামূলক ভাবে বেশি। ফলে যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাতে তুলনামূলক ভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীই অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলোপাথারি ইটবৃষ্টি ও গোলাগুলিতে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই কমবেশি আহত নিহত হলেও অধিকাংশ ঘরভাড়ি দোকানপাট ধংস হয়েছে কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরই। এবং টানা দিনদিন ব্যাপি এই ঘটনা ঘটতে দেওয়ার পিছনে প্রশাসনিক ব্যর্থতা না পরিকল্পনা দায়ী সেটি সময়ই বলতে পারবে। আপাতত এইটুকু পরিস্কার, দিল্লীর রাজপথে সরকার বিরোধী প্রতিবাদের কন্ঠরোধ করতে এই ঘটনা প্রশাসনকে অনেক সুবিধে করে দিল। সংবাদে প্রকাশ, দিল্লীর এইসব অঞ্চলে আগামী একমাস ১৪৪ ধারা জারি থাকবে। অর্থাৎ, ভালো হোক মন্দ হোক পক্ষে হোক বিপক্ষে হোক এই সময়সীমায় এই অঞ্চলে প্রতিবাদ ধর্না ইত্যাদি বন্ধ। ভয়াবহ এই ঘটনা সংঘটিত না হলে প্রশাসনের পক্ষে এই হুকুমনামা জারি করা এত সহজে সম্ভব হতো না।

দেশব্যাপি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন প্রত্যাহারের দাবিতে উত্তাল জনবিক্ষোভ প্রশমিত করতে দিল্লীর এই ঘটনা কতটা সহায়ক হয় সেটিই এখন দেখার। তবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।

কপিরাইট পোস্টমর্টেম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন