মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

দিল্লী বিধানসভা নির্বাচন ২০২০


দিল্লী বিধানসভা নির্বাচন ২০২০

ইভিএমে আঙ্গুলের চাপ দিয়ে শাহিনবাগে কারেন্ট লাগানোর ডাককে দিল্লীবাসী রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সারা ভারতে একটি স্পষ্ট বার্তা জানিয়ে দিল এই ২০২০’র দিল্লী বিধানসভা নির্বাচনে। দক্ষ প্রশাসন সুশাসন জনসেবামূলক কার্যক্রম শিক্ষা স্বাস্থ বিদ্যুৎ জল ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলিই একটি নির্বাচনের মুখ্য বিষয়। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ধর্মীয় বিভাজন জনগণের স্বাধীন কন্ঠস্বরকে দেশদ্রোহীতা বলে প্রচার ইত্যাদি বিষয়গুলি নির্বাচনে জয়লাভের পক্ষ যথেষ্ট নয়। দিল্লী নির্বাচনের আগে ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে পোশাক দেখে মানুষ চেনার সেই ঐতিহাসিক বয়ানকেও ঝাড়খণ্ডবাসী এইভাবেই রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। জনগণ দলমত ধর্ম বর্ণ শ্রেণী নির্বিশেষে সুস্থ ও নিরাপদ শান্তি ও উন্নয়নমূলক জীবনধারার প্রত্যাশী। সেই জনগণকে কিছুদিনের জন্য জাতপাতের বিভাজন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ধর্মীয় উন্মাদনা প্রতিবেশি দেশের সম্বন্ধে জাতক্রোধ ইত্যাদি বিষয়গুলি দিয়ে বিভ্রান্ত করে রাখা গেলেও, জনগণই সেই বিভ্রান্তি দূর করে সঠিক পথের হদিশ বার করার ক্ষমতা রাখে। সদ্য অনুষ্ঠিত ঝাড়খণ্ড ও দিল্লী বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সেই সত্যকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করল।

মনে রাখতে হবে, সদ্য পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধীতায় দেশব্যাপি তুমুল আন্দোলনের মধ্যেই এই দুটি বিধানসভা নির্বাচন সংঘটিত হয়েছে। ফলে এই দুই নির্বাচনের ফলাফলকে এই আন্দোলনের অভিঘাত থেকে পৃথক করে দেখা যাবে না। নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ যেভাবে পথে নেমে প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছে, তার সরাসরি প্রভাবও সদ্য অনুষ্ঠিত এই দুই নির্বাচনে দেখা গিয়েছে। দুই নির্বাচনেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ এর প্রবক্তা ও সমর্থকদের মুখ পুড়েছে।


আর এই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনকেই তুরুপের তাস করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঝড় তুলতে উঠে পড়ে লেগেছে, আইনটির প্রবক্তা ও সমর্থকেরা। তাদের কাছে পাখির চোখ ২০২১-এর রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে রাজ্যে ক্ষমতায় আসা। সেই লক্ষেই তারা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিগত কয়েক বছর ধরেই। রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় উন্মাদনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে দলীয় পতাকা হাতে মাঠে নেমে পড়েছে নেতানেত্রী কর্মী সমর্থকেরা। ইতিমধ্যেই রাজ্যব্যাপি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০২০’র সমর্থনে মিটিং মিছিল জনসভা এমনকি নাগরিকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিলি করে আইনের সপক্ষে সওয়াল করতেও শুরু করে দিয়েছে তারা। তাদের ধারণা রাজ্যের জনগণকে ধর্মীয় উন্মাদনায় উদ্দীপ্ত করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনে ভাগ করে ফেলতে পারলেই কেল্লাফতে। সেই লক্ষ্যেই তারা মুহূর্মু হুঙ্কার দিয়ে উঠছেন মঞ্চ থেকে রাস্তায়। এই যে সাম্প্রাদয়িক বিদ্বেষ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে একজোট করে সেই জোটের সব ভোট নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা, এটাই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০২০’র প্রবক্তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম। সেই কার্যক্রমেই তারা বিশেষ করে সাত দশক আগে পূর্ববঙ্গ থেকে উদবাস্তু হয়ে আসা সম্প্রদায়ের বর্তমান প্রজন্মকে নাগরিকত্ব দেওয়ার লোভ দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু তারা এটা বলছে না, তাদের হিসাব মতো যারা এখনও ভারতীয় নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত, সেই অনাগরিকরাই কি করে ভোট দিয়ে তাদেরকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এটাই বর্তমানের সবচেয়ে বড়ো প্রহসন। যেখানে ভারতীয় সংবিধানে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা আছে, একমাত্র ভারতীয় নাগরিকদেরই ভারতবর্ষের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। ভোটাধিকার নাগরিকের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। ফলে সেই অধিকার যাদের আছে, তারাই ভারতবর্ষের প্রকৃত নাগরিক। অথচ সেই অধিকার প্রাপ্ত নাগরিকদের একটা বড়ো অংশকেই নাগরিকত্ব দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তাদের কাছে ভোট ভিক্ষা করা হচ্ছে। উদ্বাস্তু সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিয়ে কুম্ভীরাশ্রু ফেলে। কি আশ্চর্য্য এক প্রহসন!  

সদ্য অনুষ্ঠিত ঝাড়খণ্ড ও দিল্লী বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল থেকে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ কোন শিক্ষা গ্রহণ করে, তার উপরেই নির্ভর করছে রাজ্যের ভভিষ্যত। দিল্লী বিধানসভা নির্বাচনে বিগত পাঁচ বছরে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণ মূলক প্রকল্প ও কার্যক্রমের সুফল, নির্বাচনী ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। এটি দেখা গিয়েছে, সরকার যদি সাধারণ মানুষের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলিকে ঠিকমত মিটাতে পারে তাহলে জনগণের সরকারের পেছনে থাকার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। পাঁচ বছর সরকারে থেকে দিল্লী সরকারের গ্রহণ করা জনকল্যাণ মূলক প্রকল্পগুলি যে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণে সমর্থ হয়েছে, সে কথা বলাই বাহুল্য। বরং এই সাফল্যকে নস্যাৎ করতে কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত সরকারী দল দিল্লীতে বিকল্প কোন সদর্থক ভুমিকাই গ্রহণ করতে পারে নি। উল্টে জাতপাতের রাজনীতি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের রাজনীতি প্রতিবেশি দেশের প্রতি ঘৃণার রাজনীতি আমদানী করেও কাঙ্খিত ফললাভে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই ঘটনা সারা ভারতের পক্ষেই অত্যন্ত সদর্থক একটি সংকেত বহন করবে বলেই আশা করা যায়। বিশেষত দেশের শিক্ষিত ছাত্র ও যুব সম্প্রদায় এই সংকেতকে সদর্থক শক্তিতে গ্রহণ করলে এদেশের রাজনীতিতে একটি বাঁক আসলেও আসতে পারে। এখন দেখার সেই বাঁক আদৌ আমাদের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে কিনা। এবং কেন্দ্রে বিপুল ক্ষমতায় অধিষ্ঠত শক্তি সেই বাঁকের অভিমুখের দিকে অগ্রসর হওয়া থেকে গোটা দেশকে কি ভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। যে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তারা দৃঢ়ভাবেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

কপিরাইট পোস্টমর্টেম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন