শনিবার, ১৩ মার্চ, ২০২১

আন্দোলনের রণকৌশল


আন্দোলনের রণকৌশল


দিল্লীর সীমান্তে আন্দোলনরত সংযুক্ত কৃষক মোর্চার নেতৃত্বস্থানীয়দের একটি দল তিনদিনের পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে স্থানে স্থানে সংগঠিত প্রতিবাদসভায় অংশগ্রহণ করছে। সাম্প্রতিক তিন কৃষি আইনের বিষয়ে তাঁদের প্রতিবাদের কারণগুলি এই বাংলার কৃষকসমাজের কাছে তুলে ধরে, আইন প্রণোয়নকারী রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষে একটি ভোটও না দেওয়ার অনুরোধ করতেই তাঁদের এখানে আসা। তাঁরা আশা করছেন পশ্চিমবঙ্গের কৃষক সমাজ সহ সাধারণ মানুষকে এই তিন কৃষি আইনের বিষয়ে ওয়াকিবহাল করতে পারলে, কেন্দ্র সরকারকে একটা ধাক্কা দেওয়া সহজ হবে। আন্দোলনরত কৃষকরা এটা সুস্পষ্ট ভাবে বুঝতে পেরে গিয়েছেন, বর্তমান কেন্দ্র সরকার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের উদ্দেশে নির্বাচনের আসন জেতা হারার বিষয় ছাড়া অন্য কোন ভাষা বোঝেন না। এই সরকার ও তার রথী মহারথীদের সাথে টক্কর দিতে গেলে তাদের ভাষাতেই তাদের সাথে কথা বলতে হবে। কৃষকরা আন্দোলনের বিষয় নিয়ে তিন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদের কারণগুলি ইতি মধ্যেই সরকারের সাথে মোট এগারো বারের বৈঠকে বোঝানোর প্রয়াস করেছেন। কিন্তু সরকার তাঁদের কথা বুঝতেই চাননি। ঠিক এই কারণেই পাঞ্জাবের সাম্প্রতিক পুরসভা নির্বাচনে কৃষকরা কেন্দ্র অধিষ্ঠত রাজনৈতিক দলটিকে একেবারে গোহারনো হারিয়ে দিয়েছেন। এমনকি দিল্লীর পুরসভার বাইইলেকশনেও একই ফলফলা ঘটেছে।


আন্দোলনরত কৃষকদের লক্ষ্য এখন একটাই। যেখানে নির্বাচন, সেখানেই এই তিন কৃষি আইন প্রণেতা রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনে হারিয়ে ক্রমাগত কোনঠাসা করতে থাকা। কারণ একমাত্র তাহলেই কেন্দ্র সরকার কৃষকদের দাবি দাওয়া মানতে বাধ্য হবে। এই আশাকেই পাখির চোখ করে এগোচ্ছে সংযুক্ত কৃষক মোর্চা। তাই তারা ভোটারদের কাছে সরাসরি পৌঁছাতে চাইছেন। শুধু এই কথাটিই বলতে। যে রাজনৈতিক শক্তি এই কালো আইন চাপিয়ে দিতে চাইছে দেশের কৃষকসমাজের উপরে, সেই শক্তিকে আর একটিও ভোট নয়। এই মোর্চার অন্যতম সদস্য শ্রদ্বেয় শ্রী যোগেন্দ্র যাদব সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে একটি কথা খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বল্লেন, বাংলার আসন্ন নির্বাচনে এই অপশক্তির ভোটের দুই শতাংশ পরিমাণ ভোটও যদি কাটা যায়, তবে আর ফল ফলবে ব্যাপক ভাবে। তাঁর আশা, বাংলায় সেই ভোট দুই শতাংশ কমলে, উত্তরপ্রদেশের আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তার প্রভাবে এই অপশক্তির প্রাপ্য ভোট আঠারো শতাংশ অব্দিও কমতে পারে। এইভাবে মধ্যপ্রদেশ কর্ণাটক সহ অন্যান্য রাজ্যেও ভোটের শতাংশ কমিয়ে দিতে পারলেই এই রাজনৈতিক শক্তিকে বিভিন্ন প্রদেশের সরকার থেকে উৎখাত করাও সম্ভব হবে। আর তখনই কেন্দ্রে নির্বাচিত সরকার আন্দোলনরত কৃষকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া মানতে বাধ্য হবে।

 

কৃষক নেতাদের এই হিসাব যথেষ্ঠই বাস্তবোচিত। কিন্তু সেই বিষয়টি সম্বন্ধে কৃষি আইন নিয়ে আসা রাজনৈতিক শক্তিও যথেষ্ঠ ওয়াকিবহাল। ফলে ছলে বলে কৌশলে তারা কিভাবে এই সমস্যার মোকাবিলা করতে চেষ্টা করবেন, কৃষক নেতাদের সেই বিষয়েও ভাবতে হবে। শুধুমাত্র নিজেদের কৌশল ঠিক করলেই হবে না। বিপক্ষের সাম্ভব্য প্রতি কৌশল সম্বন্ধেও সঠিক ভাবে আগাম অনুমান করতে হবে। এবং তার ভিত্তিতে একাধিক বিকল্প কৌশলের নীলনকশাও তৈরী করে রাখতে হবে। একমাত্র তবেই এত বড়ো অপশক্তির সাথে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। আপাতত সকলের নজর এখন ২রা মে’র দিকে। সেদিনই পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল জানা যাবে। যদিও একথা সত্য। সেদিনের নির্বাচনের ফলাফল কৃষকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও কৃষক আন্দোলনকে দমন করা সহজ হবে না। কিন্তু ফলাফল যদি কৃষকদের আশা অনুযায়ী হয়। তবে অবশ্যই কেন্দ্র সরকার অনেকটা ব্যাকফুটে চলে যেতে বাধ্য হবে। আর বর্তমান সরকারের রথী মহারথীরা সেকথা বিলক্ষণ ভালো করে জানেন বলেই, তারা সর্ব শক্তি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

 

কিন্তু তাদের এই ঝাঁপিয়ে পড়ার পথে, তারা যদি অনুমান করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করা তাদের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে আরও একটি পুলওয়ামা এবং বালাকোটের মতো ঘটনা কি আমাদের সামনে অপেক্ষা করতে পারে? না’কি সেই অতি ব্যবহৃত সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ বিদ্বেষ অস্থিরতা তৈরী করতে সাম্প্রতিক দিল্লীর দাঙ্গার মতো কোন ঘটনাও কি নির্বাচনে জিততে সংগঠিত করা হতে পারে? কারণ বর্তমানে রাজ্যে একটা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বাতাবরণ তৈরী হয়েই রয়েছে। দরকার শুধু আগুনে ঘি ঢালাটুকু। রাজ্যবাসীর উপরেই বা কৃষক আন্দোলনের কতটুকু প্রভাব পড়বে। সেকথা এখনই বলা সম্ভব নয়। অপেক্ষা করতে হবে আগামী ২রা মে পর্য্যন্ত।

১৩ই মার্চ’ ২০২১


কপিরাইট পোস্টমর্টেম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন