রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১

সখাত সলিলে


সখাত সলিলে


পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে জোট বেঁধে বামফ্রন্ট আবারো সেই ২০১৬ সালের ভুলের পুনরাবৃত্তির পথেই এগোল। সাথে আরও একটি নতুন পালক যোগ হলো। ভোটের মাস খানেক আগে সদ্য গজিয়ে ওঠা ইণ্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সাথে আসন রফা করে জোট বাঁধা। এই ত্রিবেণী সঙ্গমকে সাধারণ জনগণ কিভাবে নেবে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে আগামী ২রা মে। কিন্তু ঐতিহাসিক ভাবে এই রাজ্যে কংগ্রেস বিরোধী একটি দলের কংগ্রসের মতাদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেও ২০১৬’র বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে জোট বাঁধা বামফ্রন্টের একটি ঐতিহাসিক ভুল ছিল। বামফ্রন্টের ভোটারদের একাংশ নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থীদের বিপুল ভোট দিলেও, কংগ্রেসের ভোটাররা বাম প্রার্থীদের ভোট দেয় নি। এবং অনেক বাম ভোটার বাম প্রার্থীদের বিরুদ্ধেও ভোট দিয়েছিল। কংগ্রেসের সাথে ফ্রন্টের জোট বাঁধার প্রতিবাদ স্বরূপ। ভোটের ফলাফল বিচার বিশ্লেষণ করে তেমনটাই জানা গিয়েছে বলে অভিজ্ঞ নির্বাচনী বিশ্লেষকরা জানিয়ে ছিলেন। ফলে লাভ হয়েছিল তৃণমূলের। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফিরে এসেছিল সরকারে। তাই এবারে একনিষ্ঠ বাম সমর্থকদের অনেকের আশা ছিল ফ্রন্টের গতস্য শোচনা হবে। কিন্তু অবস্থা বিপাকে সেটিও হয় নি। উল্টে ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শের সাথে আপোস করে সঙ্গে নিতে হয়েছে ইণ্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টকে। এই ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের ধর্মনিরপেক্ষতা কতটা প্রকৃত মুখ আর কতটা মুখোশ। সেই বিষয়ে জনগণের মনে যথেষ্ঠ সন্দেহ বর্তমান।


অনেকেই আশংকা করছেন, বামফ্রন্টের এই অবিমিষ্যকারিতার কারণেই বাম ভোটের একটা বড়ো অংশই হয় তৃণমূল নয় বিজেপীতে চলে যাবে। সাম্প্রতিক রাজনীতির সাম্প্রদায়িক আবহাওয়ায় সেটাই অনিবার্য। সদ্য গজিয়ে ওঠা ইণ্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের ইসলামিক আবহাওয়ায় হিন্দু মুসলিম ভোটের মেরুকরণ আরও ব্যাপক হবে। একদিকে হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলের ঘোষিত হিন্দুত্ব। অন্যদিকে ইণ্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের ইসলামিক আবহাওয়া। এই দুই পরস্পর বিরোধী বিপরীত শক্তির কারণে রাজ্যে এবারে সাম্প্রদায়িক ভোট প্রায় আড়াআড়ি দুই ভাগে ভাগ হয়ে এতে পারে। একথাও সত্য, ইণ্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট মাত্র ছাব্বিশটি আসনে প্রার্থী দিচ্ছে। যাদের সকলেই একই সম্প্রদায় ভুক্তও নয়। কিন্তু এবারের নির্বাচনের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের পরিবেশে সদ্য আবির্ভুত এই দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ সাধারণ ভোটারদের ভিতরেও একটা সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি জাগিয়ে তুলবে বলেই আশংকা করা যায়।


যার একমাত্র লাভ হবে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তিরই। রাজ্যবাসীর ভিতরে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ভোটারই এই হিন্দুত্ববাদীদের প্ররচনায় পা দিয়ে ফেলবেন। বিশেষ করে বামফ্রন্টের মতো একটি শক্তি ইণ্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের মতো ইসলামিক মুখের একটি দলের সাথে জোট বাঁধায় হিন্দুত্ববাদী কিন্তু বাম মনোভাব সম্পন্ন ভোটারা বামফ্রন্টের থেকে আরও দূরে সরে যাবেন। ফলে এবারের ভোটে এর একটা মারাত্মক ফল ফলবে। উল্টো দিকে ইসলামিক সেকুলার ফ্রন্টের ইসলামিক মুখের কারণে, সংখ্যালঘু ভোটের একটা বড়ো অংশই এবারে তৃণমূল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ফলে সেই দিক থেকেও লাভ হবে সেই হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তিরই।


হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তির মূল লক্ষ্য একটিই। সাম্প্রদায়িক ভোটের মেরুকরণ। সেটি ঘটাতে পারলেই কেল্লাফতে। ভোট শতাংশের হারে বিধানসভা দখল শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। ফলে বামফ্রন্টের কংগ্রেস ও সদ্য আত্মপ্রকাশ করা ইণ্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সাথে জোট বাঁধা একদিকে সেই সাম্প্রদায়িক ভোটের মেরুকরণে যেমন সাহায্য করবে। ঠিক তেমনই বাম মতাদর্শের ভোটারদের একটা বড়ো অংশকেই বামফ্রন্ট বিরোধী অবস্থানের দিকে ঠেলে দেবে। যাদের ভোট মূলত ভাগ হয়ে যাবে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দিকেই। অর্থাৎ বিজেপী ও তৃণমূলে। এখন সামগ্রিক ভাবে এর ফলে এই দুই দলের কে বেশি লাভবান হবে সেটি জানা যাবে একমাত্র ভোটের ফলাফলের বিশ্লেষণের ভিতর দিয়েই। কিন্তু রাজ্য রাজনীতিতে বামফ্রন্ট যে আরও বেশি করে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। সেই বিষয়ে বিশেষ সন্দেহের অবকাশ নাই।


বামফ্রন্ট একটি রাজনৈতিক মতাদর্শগত অবস্থান। নির্বাচনী অংকের হিসাব নিকাশ এক বিষয়। আর্থ-সামজিক রাজনৈতিক মতাদর্শগত অবস্থান আর এক বিষয়। এই দুই অবস্থানের ভিতরে আপস করতে গেলে ফল তো ভুগতে হবেই। ২০১৬’র বিধানসভা নির্বাচনে সেই মাশুল দেওয়ার পরেও যদের হুঁশ হয় না। তাদের জনসমর্থন যে দ্রুত কমতে থাকবে এ আর বিচিত্র কি? মানুষের মনে এই প্রশ্নই দানা বাঁধবে যে, তাহলে অন্যান্য রাজনৈতিক শিবিরের থেকে বামফ্রন্টের তফাৎ কোথায়। বরং কট্টর হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক দলটির তবু একটা ঘোষিত মতাদর্শ রয়েছে। যে মতাদর্শ থেকে তাদের সরানো যাচ্ছে না কোনভাবেই। সেই মতাদর্শ নিয়ে যত প্রশ্নই থাক। তাদের মতাদর্শের সাথে আপস করতে দেখা যায় না অন্তত। আর এইখানেই ২০১১ পরবর্তী বামফ্রন্টের অধঃপতনে বীতশ্রদ্ধ অধিকাংশ রাজ্যবাসীই। মানুষের কাছে এখন এই বার্তাটি পরিস্কার। বামফ্রন্টের মতাদর্শগত ভিত টলে গিয়েছে। কারণ তারা আর মতাদর্শগত অবস্থানের উপরে সুদৃঢ় ভরসা রাখতে পারছে না, নিজেরাই। যে কোন রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষে এ এক গভীরতর সংকট। কংগ্রেস ও ইণ্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সাথে জোট বেঁধে অস্তিত্ব রক্ষার থেকেও বড়ো জরুরী ছিল, সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার প্রয়াস করা। কিন্তু বিধি বাম। বামফ্রন্টের নীতিনির্ধারকদের ভিতর সেই বোধ আর কাজ করছে না। ফলে সখাত সলিলে আত্মবিসর্জনের অভিমুখেই পা বাড়িয়ে তারা।


১৪ই মার্চ’ ২০২১


কপিরাইট পোস্টমর্টেম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন